আমরা সামাজিক সংগঠন কেনো করবো?

মোহাম্মদ আফফান উদ্দিন প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ৫:৫০ পূর্বাহ্ণ
আমরা সামাজিক সংগঠন কেনো করবো?

মানুষ হলো প্রকৃত অর্থে সামাজিক প্রাণী। একা মানুষের জীবন অসম্পূর্ণ, সমাজ ছাড়া তার অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপেই মানুষ অন্য মানুষের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সমাজের ভেতরে বাস করেও যদি আমরা একে অপরের দুঃখ-সুখে পাশে না দাঁড়াই, তবে সেই সমাজ হয়ে ওঠে আত্মকেন্দ্রিক ও অমানবিক। তাই সুস্থ, সুন্দর ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তুলতে সামাজিক সংগঠনের বিকল্প নেই।


সামাজিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা

১. সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা

প্রত্যেক মানুষের জীবনে কোনো না কোনো সময় সমস্যা আসবেই। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, রোগব্যাধি, দুর্ঘটনা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—এসব মোকাবিলায় এককভাবে দাঁড়ানো কঠিন। সংগঠন মানুষকে শেখায় একসঙ্গে কাজ করতে, ভাগাভাগি করে নিতে এবং সহযোগিতা করতে। এটি কেবল সাময়িক সহায়তা নয়, বরং সমাজে সহমর্মিতা ও ভালোবাসার বীজ বপন করে।

২. অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ শক্তি

ইতিহাস সাক্ষী—যে সমাজ সংগঠিত, তারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি। সামাজিক সংগঠন মানুষকে সাহস যোগায়, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বোঝায় এবং শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ করে। একক প্রতিবাদ ক্ষীণ হলেও সংগঠিত কণ্ঠস্বর পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

৩. মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চা

সামাজিক সংগঠন মানুষকে কেবল ভৌত সহায়তা দেয় না, বরং তাদের মানসিক ও নৈতিক উন্নয়নেও সহায়তা করে। যখন মানুষ স্বেচ্ছায় দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন তার ভেতরে উদারতা, আত্মত্যাগ, ভ্রাতৃত্ববোধ, সহমর্মিতা ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটে।

৪. শিক্ষা ও সচেতনতার প্রসার

একটি উন্নত সমাজ গড়ে তুলতে হলে শিক্ষার আলো সবার ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। সামাজিক সংগঠনই পারে শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে—বিনামূল্যে টিউশন, গ্রন্থাগার স্থাপন, সচেতনতা সেমিনার, স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের পুনরায় পড়াশোনায় যুক্ত করা ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে। একইভাবে মাদক, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, নারী নির্যাতনের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে সংগঠন ভূমিকা রাখতে পারে।

৫. প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো

সমাজে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন যাদের মৌলিক চাহিদা—খাবার, আশ্রয়, চিকিৎসা, শিক্ষা—মেটানোই কষ্টসাধ্য। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সবসময় সবার কাছে পৌঁছায় না। সেক্ষেত্রে সামাজিক সংগঠনই হয়ে ওঠে তাদের আশ্রয়স্থল। মানবিক সহায়তার হাত প্রসারিত করে এই সংগঠনগুলো সমাজে সমতা আনে।

৬. যুব সমাজের নেতৃত্ব ও কর্মসংস্থান

একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। তরুণরা যদি অসৎ পথে যায়, তবে সমাজ ধ্বংসের দিকে এগোয়; আর যদি তারা সঠিক পথে, সংগঠিতভাবে কাজ করে, তবে সমাজ সমৃদ্ধ হয়। সামাজিক সংগঠন তরুণদের গড়ে তোলে নেতৃত্বদায়ী, দায়িত্বশীল ও কর্মক্ষম নাগরিক হিসেবে। স্বেচ্ছাসেবী কাজ, সমাজসেবা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের জীবন ইতিবাচক দিকে মোড় নেয়।

৭. সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা

প্রতিটি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ধরে রাখা জরুরি। সামাজিক সংগঠন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও জাতীয় দিবস উদযাপনের মাধ্যমে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং জাতীয় চেতনা জাগ্রত রাখে।

৮. জাতীয় উন্নয়নে অবদান

রাষ্ট্রের উন্নয়নে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; জনগণকেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে। সামাজিক সংগঠন স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নমূলক কাজ করে—যেমন সড়ক মেরামত, বৃক্ষরোপণ, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, রক্তদান কর্মসূচি ইত্যাদি। এগুলো জাতীয় উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করে।


বাস্তব উদাহরণ

বাংলাদেশে অসংখ্য সামাজিক সংগঠন দুর্যোগকালীন সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অসংগঠিত মানুষ যখন সংগঠিত হয়েছিল, তখনই স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল। সাম্প্রতিক বন্যা, করোনা মহামারি কিংবা ঘূর্ণিঝড়ে সামাজিক সংগঠনগুলোই সবচেয়ে আগে দুর্গত মানুষের কাছে ছুটে গেছে। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে সামাজিক সংগঠনের প্রয়োজন কতটা অপরিহার্য।


উপসংহার

আমরা সামাজিক সংগঠন করবো, কারণ এটি কেবল দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যম নয়, বরং একটি উন্নত, ঐক্যবদ্ধ ও ন্যায্য সমাজ গড়ে তোলার শক্তি। সংগঠন মানুষকে শেখায় নিজের চেয়ে অন্যের কল্যাণকে বড় করে দেখতে, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে এবং মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করতে। যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ সংগঠিত হয়, তখন সেই সমাজ অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়, আর জাতি হয়ে ওঠে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী।