রক্ত দেয়ার আগে জানা জরুরি কিছু তথ্য
রক্তদানের গুরুত্ব ও একজন রক্তদাতার অনন্য অবদান
জেমস হ্যারিসন নামে একজন অস্ট্রেলীয় ব্যক্তি জীবদ্দশায় প্রায় ১,১৭৩ বার রক্ত দান করে প্রায় ২০ লক্ষ শিশুর জীবন রক্ষা করেছেন। এই কারণে তিনি গিনেস রেকর্ডসে নাম লেখান। (BBC)
তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে একটি জরুরি অপারেশনের সময় বিপুল পরিমাণ রক্ত খরচ করেছিলেন, এবং সেটি পেয়ে বেঁচে যান। এরপর ১৮ বছর বয়সে নিয়মিত রক্ত দান করা শুরু করেন।
দেশে রক্তের চাহিদা ও ঘাটতি
বাংলাদেশে প্রতি বছর ৮–৯ লাখ ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন হয়, কিন্তু সংগ্রহ করা হয় মাত্র ৬–৬.৫ লাখ ব্যাগ। ফলে প্রায় ৩ লাখ ব্যাগের ঘাটতি থাকে। তার মধ্যে মাত্র ৩০% রক্ত আসে স্বেচ্ছায় দাতাদের মাধ্যমে; বাকি অংশ আসে পরিবার বা পেশাদার দাতাদের কাছ থেকে।
কারা রক্ত দিতে পারেন?
ডাক্তারদের মতে, ১৮ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে শারীরিক দিক থেকে সুস্বাস্থ্য থাকা নারী বা পুরুষ রক্ত দিতে পারেন।
কিছু শর্ত রয়েছে:
১। পুরুষকে কমপক্ষে ৪৮ কেজি ও মহিলাকে ৪৫ কেজি ওজন থাকতে হবে।
২। রক্তচাপ, শরীরের তাপমাত্রা ও পালস স্বাভাবিক হতে হবে।
৩। রক্তদানের সময় রক্তদাতার হিমোগ্লোবিন পরিমাপ করা হয়: পুরুষের ক্ষেত্রে ১৫ গ্রাম/ডেসিলিটার, মহিলার ক্ষেত্রে ১৪ গ্রাম/ডেসিলিটার।
৪। রক্তদাতা কোনও ধরনের ভাইরাল, শ্বাসযন্ত্র বা চর্মরোগে আক্রান্ত থাকলে দেওয়া যাবে না। (BBC)
৫। একটি দান ও ভবিষ্যতে দান করার মধ্যে ৯০ দিন অপেক্ষা প্রয়োজন, অর্থাৎ ৩ মাস পর পর দান করা যেতে পারে। (BBC)
রক্তদান প্রক্রিয়া ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া
প্রতি দানে সাধারণভাবে ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত নেওয়া হয়। রক্তদানের ফলে দেহ থেকে প্রায় ২৫০–৩০০ মিলিগ্রাম আয়রন হারায়, তাই দান পর পর প্রোটিন ও আয়রনযুক্ত খাবার বেশি করে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। দান করার পর কিছুটা মাথা ঘোরা স্বাভাবিক, এজন্য দানকারীকে ১–২ ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়া উচিত এবং অতিরিক্ত শারীরিক হক-ডাক করা উচিত নয়। রক্তদানের পর রক্তের রক্তকণিকার সংখ্যা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে প্রায় ১–১.৫ মাস সময় নেয়।
রক্তদানের উপকারিতা
১। একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়।
২। নিয়মিত দানকারীদের মধ্যে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যেতে পারে।
৩। দান করলে নতুন রক্তকণিকা উৎপাদন বাড়ে, অস্থিমজ্জা সক্রিয় হয়।
৪। রক্তে কোলেস্টেরল কমতে পারে, ফলে হার্ট ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকতে সাহায্য করে।
৫। দান করার সময় যা ক্যালোরি খরচ হয়, তা ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
৬। দানকারী বিনা খরচে বিভিন্ন ভাইরাল রোগ (যেমন হেপাটাইটিস, এইচআইভি) পরীক্ষার সুযোগ পায়।
৭। রক্তদাতা যদি ভবিষ্যতে নিজেই রক্ত প্রয়োজন হয়, তাহলে রক্তব্যাংকগুলি প্রায়শই তাদের অগ্রাধিকার দেয়।
আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত ও প্রচেষ্টা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী বছরে প্রায় ৯ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ রক্ত দান করেন। উন্নত দেশগুলিতে এক হাজার মানুষের মধ্যে ৪০ জন রক্ত দেন, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে মাত্র ৪ জন করে দান করেন। ২০২০ সালের মধ্যে “শুধুমাত্র স্বেচ্ছায় রক্তদান” নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রতি বছরের ১৪ জুন “বিশ্ব রক্তদাতা দিবস” পালিত হয়, যার উদ্দেশ্য রক্তদাতাদের সম্মান জানানো ও সাধারণ মানুষকে উৎসাহ দেওয়া।
আপনার মতামত লিখুন